সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ সিদ্ধান্তের ফলে বিতরণে সম্পৃক্তদের (ডিলার) জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে। সার কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে, কত দামে বিক্রি হচ্ছে এবং কৃষক প্রকৃতপক্ষে সার পাচ্ছেন কিনা—এসব নজরদারি সহজ হবে। তবে খুচরা সার বিক্রেতাদের দাবি, মাঠপর্যায়ে প্রায় ৪৪ হাজার দীর্ঘদিনের বিক্রেতাকে বাদ দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা কয়েক হাজার ডিলারের ওপর কেন্দ্রীভূত হলে স্থানীয় বাজারে ক্ষমতা ও সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ অল্প কিছু ব্যবসায়ীর হাতে গিয়ে সিন্ডিকেট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তের ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। ঠিকমতো এটি কাজ না করলে কৃষকের জন্য নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। আর ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা গেলে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে খুচরা বিক্রেতা প্রথা বাতিলে কৃষকের সার সংগ্রহের জন্য পরিবহন ব্যয় ও সময় বাড়তে পারে বলেও মত তাদের।
এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ‘খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’। পরে সংগঠনটির একটি প্রতিনিধি দল কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও সচিব মো. সেলিম খানের সঙ্গে বৈঠকও করে।
গত ১০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫ (সংশোধিত)’ প্রকাশ করে। আগে ইউরিয়া সারের ডিলারশিপ বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও নন-ইউরিয়ার ডিলারশিপ দিত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সংশোধিত নীতিমালায় পৃথক ডিলার কাঠামো একীভূত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের অনিয়ন্ত্রিত সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বাদ দিয়ে বিক্রয় প্রতিনিধি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। নীতিমালায় ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সর্বোচ্চ তিনজন ডিলারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রত্যেক ডিলারকে নির্ধারিত এলাকায় নিজস্ব বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সার বিক্রির কথা বলা হয়েছে।
সংশোধিত নীতিমালায় বলা হয়, একজন ডিলারের মূল ব্যবসা কেন্দ্রের পাশাপাশি আরো দুটি বিক্রয় কেন্দ্র থাকবে। এসব বিক্রয় কেন্দ্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। আর বিক্রয় প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবেন ডিলার, সেটি অনুমোদন দেবে উপজেলা বা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, আগের কাঠামোয় ডিলার, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার একাধিক স্তর থাকায় সরবরাহের শেষ প্রান্তে গিয়ে সার কার হাতে যাচ্ছে, সেখানে দাম কত বাড়ছে কিংবা কোথায় মজুদ হচ্ছে তা অনুসরণ করা কঠিন ছিল। নতুন ব্যবস্থায় ডিলারকেই সরবরাহের জন্য দায়বদ্ধ করার ফলে একটি নির্দিষ্ট জবাবদিহির জায়গা তৈরি হবে।
তবে খুচরা বিক্রেতারা জানান, তারা ২০০৯ সাল থেকে সরকারি অনুমোদন ও কার্ড নিয়ে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করে আসছেন। তাদের দাবি, সারা দেশে প্রায় ৪৪ হাজার কার্ডধারী খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা। দীর্ঘদিনের ব্যবসা, ব্যাংক ঋণ ও কৃষকদের সঙ্গে বাকিতে লেনদেনের কারণে হঠাৎ করে তাদের বাদ দিলে আর্থিক ক্ষতি সামাল দেয়া কঠিন হবে।
তারা আরো বলছেন, গ্রামীণ কৃষক সবসময় নির্দিষ্ট বিক্রয় কেন্দ্রে গিয়ে সার সংগ্রহ করতে পারেন না। স্থানীয় দোকানির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বাকিতে সার পাওয়ার সুযোগ ও বাড়ির কাছাকাছি পণ্য পাওয়ার সুবিধা—এসব কারণে খুচরা বিক্রেতারা একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু কার্যকর সরবরাহ অবকাঠামো তৈরি করেছেন। এ বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু প্রশাসনিকভাবে সরবরাহ চেইন ছোট করলে মনিটরিং সহজ হলেও মাঠে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
আন্দোলনে নামা সংগঠন ‘খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সভাপতি মো. ফোরকান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সরকারের অনুমোদন নিয়েই সার সরবরাহ করছিলাম। গ্রাম পর্যায়ে আমরা কাজ করি। সবসময় কৃষকের হাতে টাকা থাকে না, তারা বাকিতে সার নেন। ফসল তুলে টাকা দেন। এমন সেবা দেয়ার কারণে তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সারা দেশে ৪৪ হাজারের মতো খুচরা সার বিক্রেতা রয়েছেন। এ সিদ্ধান্তে এ পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়বে। কৃষকের কাছে থাকা বাকির অর্থ আদায়েও ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাজারে বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে কৃষককে জিম্মি করার ঝুঁকি থাকে। আমরা মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা সময় চেয়েছেন। আশা করি, সমস্যার সমাধান হবে।’
অবশ্য ডিলার পয়েন্টে সার না পাওয়া কিংবা খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। চলতি আমন মৌসুমেও দেশের বিভিন্ন জেলায় বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। গত বছর নীতিমালা প্রণয়নের সময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সার বিতরণে কৃত্রিম সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব ও ডিলারদের কারসাজি ঠেকাতেই কাঠামো পরিবর্তন করা হচ্ছে। বণিক বার্তাকে তখন কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরাও জানিয়েছিলেন, সার বিতরণে অনিয়মে জড়িত দুই হাজারের বেশি ডিলার। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন তখন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিলার কমসংখ্যক হলে প্রত্যেকের ওপর প্রশাসনিক নজরদারি তুলনামূলক সহজ হতে পারে। ডিজিটাল হিসাব, নির্ধারিত বিক্রয় কেন্দ্র, গুদাম, বরাদ্দ ও বিক্রির তথ্য সংরক্ষণ—এসব কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সার সরবরাহের প্রতিটি ধাপের তথ্য সরকারের হাতে থাকবে। ফলে অতিরিক্ত দামে বিক্রি, মজুদ বা কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনা শনাক্ত করা সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু বিপরীতে সংকটের কথাও বলা হচ্ছে। একজন ডিলারের অধীনে একাধিক বিক্রয় কেন্দ্র থাকায় স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা, নিয়মিত তদারকি ও বিকল্প সরবরাহকারী না থাকলে কোনো এলাকায় সার সংকট দেখা দিলে ডিলারই কার্যত বাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারেন। বিশেষ করে সার মৌসুমে সরবরাহ সামান্য কমে গেলেই মূল্য ও প্রাপ্যতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে ক্রেতার দরকষাকষির সুযোগ থাকে। ক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এটি আরো প্রকট। সেজন্য সরকার যদি কঠোরভাবে তদারক করতে পারে কিংবা অনিয়ম হলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে তাহলে কিছুটা স্বচ্ছতা আসতে পারে। সেজন্য কারা ডিলারশিপ পাচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি অসাধুরা পান তাহলে সেখানে অস্বচ্ছতার শঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবও এভাবে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘একেবারে খুচরা বিক্রেতার প্রথা তুলে দেয়া হলে সার সংগ্রহে কৃষকের অর্থ ব্যয় ও সময় বাড়তে পারে। কারণ এখন কৃষক তার বাড়ির পাশের দোকান থেকে কিনতে পারছেন। বিক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে তাকে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে যেতে হবে।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণের উদ্যোগটি ভালো। এর মাধ্যমে বিতরণ ব্যবস্থা সহজ হবে। তবে ডিলারদের অধীনে যেসব বিক্রয় প্রতিনিধি থাকবেন তাদের অভিজ্ঞ হতে হবে এবং সুনাম আছে এমন কাউকে নিতে হবে। এটি করলে কৃষকের সার প্রাপ্তি সহজ হবে।’
তবে এতে নিয়মিত কঠোর তদারক না করলে সংকটকালে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডিলাররা ভর্তুকি মূল্যে সার বিক্রি করবেন। সরকার নির্ধারিত দামেই তারা বিক্রি করবেন। এখানে দুর্বৃত্তায়ন না হলে এ সিদ্ধান্ত ভালো ফল দেবে। তবে সারের ক্রাইসিস দেখা দিলে ডিলারদের মধ্যে দুর্বৃত্তায়ন দেখা দিতে পারে। সেজন্য সরকারি মনিটরিং সিস্টেমটা আরো জোরালো হতে হবে। অনিয়ম পেলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার চাইলে ডিলারকেন্দ্রিক ব্যবস্থা চালু রেখেও স্থানীয় বিক্রয় প্রতিনিধিদের কার্যক্রমকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি বিক্রয় কেন্দ্রের বিক্রি, মজুদ ও বরাদ্দের তথ্য ডিজিটাল প্লাটফর্মে প্রকাশ, কৃষকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি ও ডিলার পরিবর্তনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা দরকার বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারোর বিক্রির অনুমোদন স্থগিত করা হয়নি। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এ নিয়ে আমার সঙ্গে আজ খুচরা বিক্রেতাদের মিটিং হয়েছে, পরে সচিব সাহেবের সঙ্গে হয়েছে। সব ঠিক হয়ে যাবে আশা করি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার জন্ম যে ইউনিয়নে, ওইখানে যে কয়টা বাজার আছে প্রত্যেকটাতে সারের দোকান আছে। কারণ ওই বাজার এলাকার কৃষককে আরেক বাজারে যেতে হলে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। আমরা কোনো ব্যবসায়ীকে বলিনি সার বিক্রি করা অবৈধ। তবে অফিশিয়াল, গভর্নমেন্ট সিলেকশন বা রিক্রুটেড অথবা সার্টিফায়েড ডিলার কতজন থাকবেন এ জিনিসটা নিয়ে কাজ করছি। আগে যারা ছিলেন তারা মাইনাস না। তাদের মধ্যে যারা আমাদের ক্রাইটেরিয়ার ভেতরে পড়বেন তারা আবেদন করলে আমরা যাচাই করব। যদি ঠিক থাকে তাদের রাখব। কিন্তু সেটা হবে সিস্টেমেটিক। জবাবদিহিমূলক।’